এম এ আজীম
প্রকাশ: ২ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫৪

মশা নিধনে ওষুধ দিচ্ছে সিটি করপোরেশন। ছবি: সময় সংবাদ
মশা নিধনে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন বছরে কোটি কোটি টাকার ধোঁয়া উড়ায়। তবে ডেঙ্গু প্রতিরোধে এই ধোঁয়া কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। মশা নিধন নাকি কোটি টাকার বাণিজ্য; এ নিয়েও উঠছে প্রশ্ন।
এডিস মশা নিধন নাকি সিটি করপোরেশনের বাণিজ্য; তা জানতে অভিযানের পর দুদক বলছে, গত পাঁচ বছর ধরে কিউলেক্স মশার ওপর পরীক্ষা করা কীটনাশক দিয়ে এডিস নিধন কার্যক্রম চালানো হয়েছে।
দুদকের সহকারী পরিচালক রাজু আহমেদ বলেন, প্রতি বছর কিউলেক্স মশার নমুনার ওপর কীটনাশক প্রয়োগ করে সফল হওয়ার মর্মে একটি প্রত্যয়ন দাখিল করা হয়েছে। কিন্তু এডিস মশার ওপর প্রয়োগ করে সফল হওয়ার কোনো নথিপত্র পাওয়া যায়নি।
তবে সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন কর্মকর্তারা বলছেন, কার্যকারিতা পরীক্ষা করেই এসব কীটনাশক এডিস নিধনে ব্যবহার করা হয়। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বিগ্রেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী বলেন, নির্দিষ্ট কোনো মশার জন্য ব্যবহৃত হয়; এমন কোনো ইনসেক্টিসাইড কোথাও নেই।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ড. জাহাসে ফেরদৌস বিনতে রহমান বলেন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুধু এখানে হয় না। আইডিসিআর ও পিপিডব্লিউতেও পরীক্ষা হয়। সেসব জায়গা থেকে রিপোর্ট নিয়ে এরপর কীটনাশক ব্যবহার করা হয়।
কিন্তু সেই পরীক্ষা কার্যক্রম ঘুরে দেখতে গিয়ে দেখা যায়, রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন মূলত দুটি প্রতিষ্ঠানে কীটনাশকের কার্যকারিতা পরীক্ষা করে। এর মধ্যে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট-আইইডিসিআরের গবেষণাগারে খাঁচায় থাকা কিউলেক্স মশার ওপরই সিটি করপোরেশনের কীটনাশকের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়।
তবে সেই কীটনাশক এডিস মশা নিধনে কতটা কার্যকর, তার উত্তর জানা নেই এখানকার গবেষকদেরও। আইইডিসিআরের একজন গবেষক বলেন, এ বিষয়ে এন্টমোলজি ডিপার্টমেন্ট বলতে পারবে।
একইভাবে খামারবাড়ির গবেষকদের পরীক্ষার দোহাই দিয়ে বছরের পর বছর যেসব কীটনাশক দিয়ে মশা নিধন করছে সিটি করপোরেশন, সেগুলো এডিস নিধনে কতটা কার্যকর, তা জানেন না তারাও।
খামারবাড়ির একজন গবেষক বলেন, এডিস মশার বিরুদ্ধে কীটনাশক কতটা কার্যকর, সেটার পরীক্ষা করা হয় না। মশার বিভিন্ন প্রজাতি রয়েছে। তারা শুধু পরীক্ষা করেন, ওই স্যাম্পলের মধ্যে অ্যাক্টিভ ইনগ্রেডিয়েন্ট যথাযথভাবে আছে কি না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এডিস মশা জন্মানোর স্থান ও জীবনচক্র অনুযায়ী নিধনের জন্য কীটনাশক নয়, বর্তমান বিশ্বের সফল পদ্ধতি ওলবাকিয়া। গবেষণাগারে তৈরি ব্যাকটেরিয়াযুক্ত পুরুষ এডিস মশা প্রকৃতিতে ছেড়ে দিয়ে স্ত্রী এডিস মশার মাধ্যমে ডেঙ্গু ভাইরাস ধ্বংস করা হয় এ পদ্ধতিতে।
আইইডিসিআরের পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকী বলেন, ওলবাকিয়া নামে একটি ব্যাকটেরিয়া দিয়ে মশার বায়োলজিক্যাল কন্ট্রোলের একটি জনপ্রিয় পদ্ধতি বিভিন্ন দেশে প্রচলিত আছে। এর অংশ হিসেবে পরবর্তীতে এ ধরনের বায়োলজিক্যাল কন্ট্রোল বাংলাদেশে ব্যবহার করা যাবে কি না, সে বিষয়ে প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে।
তাহলে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ মারা গেলেও কেন এই পদ্ধতিতে এডিস নিধন করছে না সিটি করপোরেশন-তা জানতে আবারও প্রধান দুই স্বাস্থ্য কর্মকর্তার মুখোমুখি হয় সময় সংবাদ। এবার খরচ আর জনবিভ্রান্তির দোহাই দেন তারা।
ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ড. জাহাসে ফেরদৌস বিনতে রহমান বলেন, এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল একটি পদ্ধতি। মশাকে বন্ধ্যা করে সেই মশার প্রজনন আটকে রাখা হয়। বাংলাদেশ আসলে একটু গরিব দেশ।
ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বিগ্রেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী বলেন, এলাকাবাসীকে ভালোভাবে বোঝাতে হবে যে, যে মশা ছাড়া হচ্ছে, সেটি ভালো মশা এবং সেটিকে মারা যাবে না। এ জায়গায় এসে তারা আর এগোতে পারেননি।
অথচ আন্তর্জাতিক মহামারী গবেষণা, জনস্বাস্থ্য বিষয়ক গাণিতিক মডেলিং এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রাথমিক পর্যায়ে কীটনাশক ছিটানো বা ফগিংয়ের মেশিন কেনার চেয়ে ওলবাকিয়া পদ্ধতির জন্য ল্যাব স্থাপনের খরচ বেশি।
তবে পরবর্তীতে রাষ্ট্রের বিপুল টাকা সাশ্রয় হবে। ওলবাকিয়া পদ্ধতিতে প্রতি বছর মশা নিজেরাই বংশবৃদ্ধি করে ডেঙ্গু প্রতিরোধে কাজ করে। যেখানে ফগিং ও স্প্রের জন্য কোটি কোটি টাকার কীটনাশক কিনতে হয়। কার্যকারিতা ও চিকিৎসা ব্যয় হিসাব করলেও ওলবাকিয়া পদ্ধতি সিটি করপোরেশন বা রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকার খরচ কমায়।

