বাংলাদেশ

শীতের আগমনী হাওয়া বদলে দিচ্ছে সমুদ্রসৈকতের চিত্র

সুজাউদ্দিন রুবেল, কক্সবাজার

প্রকাশ: ২ অক্টোবর ২০২৬, ১৫:২৫

শীতের আগমনী হাওয়া বদলে দিচ্ছে সমুদ্রসৈকতের চিত্র

শীতের আগমনী হাওয়ায় বদলে যেতে শুরু করেছে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের চিত্র। এক সপ্তাহ আগেও যেখানে ছিল উত্তাল ঢেউ, এখন সেখানে তুলনামূলক শান্ত সাগর। কমেছে ঢেউয়ের তীব্রতা, বেড়েছে জলরাশির স্বচ্ছতা। এর সঙ্গে বাড়ছে পর্যটকের আনাগোনাও।


শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে কলাতলী পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার সৈকতে পর্যটকদের ভিড় দেখা যায়। কেউ বালুচরে হাঁটছেন, কেউ ছবি তুলছেন, আবার কেউ ঘোড়ায় চড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সব মিলিয়ে সৈকতজুড়ে ছিল উৎসবের আমেজ।


সুগন্ধা পয়েন্টের বালুচরে চার বান্ধবী সানজিদা, ছোঁয়া, রিয়া ও শিউলিকে আনন্দে মেতে থাকতে দেখা যায়। সানজিদা ও ছোঁয়া একে অপরের ছবি তুলছিলেন। আর রিয়া ও শিউলি ঘোড়ায় চড়ে বালুচরের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত ঘুরছিলেন।


সানজিদা নাসরিন বলেন, ‘শহুরে জীবন অনেক ক্লান্তিকর ও একঘেয়ে। সারাদিন বিল্ডিং আর ক্লাসের ব্যস্ততার পর বাসায় ফেরাই যেন রুটিন। কিন্তু কক্সবাজারে এলে সমুদ্রের গর্জন, মানুষের কোলাহল আর প্রকৃতির সৌন্দর্য মিলিয়ে এক অন্যরকম অনুভূতি হয়।’


সানজিদার ভাষ্য, কক্সবাজারে তাঁর এটি প্রথম ভ্রমণ নয়। যতবারই এসেছেন, সমুদ্রের গর্জন তাঁকে মুগ্ধ করেছে। তাঁর কাছে সমুদ্রের গর্জন ব্যস্ত জীবন থেকে দূরে প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়ার এক ধরনের প্রশান্তি।


ঘোড়ায় চড়ে ও ছবি তোলার পর শিউলি বলেন, ছোটবেলায় ঘোড়ায় উঠেছিলেন। তখন অনেক ভয় লাগত। আজ আবার ঘোড়ায় উঠে তেমন ভয় লাগেনি। বরং ভালোই লেগেছে। ঘোড়াটিকেও তাঁর বন্ধুর মতো মনে হয়েছে। ঘোড়াগুলোর মালিকেরা যেন প্রাণীগুলোর যত্ন নেন এবং ঠিকমতো খাবার দেন-এমন প্রত্যাশাও করেন তিনি।


শিউলি বলেন, ‘এখনও সাগরে নামিনি। সাগরে যাওয়ার পর আরও ভালো লাগবে বলে মনে হচ্ছে। সব মিলিয়ে বেশ মজা করছি।’


গত সপ্তাহেও কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত ছিল উত্তাল। উপকূলে আছড়ে পড়ছিল বড় বড় ঢেউ। সেই ঢেউয়ের সঙ্গে আনন্দে মেতেছিলেন পর্যটকেরা। এক সপ্তাহের ব্যবধানে বদলে গেছে সেই চিত্র। এখন সাগর তুলনামূলক শান্ত, কমেছে ঢেউয়ের তীব্রতা। স্বচ্ছ হয়ে উঠছে জলরাশি।


প্রকৃতির এই পরিবর্তন শীতের আগমনী বার্তা দিচ্ছে বলে মনে করছেন পর্যটকেরা। আর শীতের টানেই ধীরে ধীরে বাড়ছে ভ্রমণপিপাসু মানুষের আনাগোনা। ছুটির দিনে বিশেষ করে সুগন্ধা, লাবণী ও কলাতলী পয়েন্ট ঘিরে বাড়ছে ভিড়।


ঢাকার উত্তরা থেকে স্ত্রী, সন্তান ও বন্ধুদের নিয়ে কক্সবাজারে এসেছেন সবিবুর রহমান। তিনি বলেন, শহরের ব্যস্ততা ও ক্লান্তি থেকে স্বস্তি পেতে কক্সবাজারে আসেন। প্রিয়জনদের সঙ্গে এখানে সময় কাটানোর অনুভূতি আলাদা। এবার প্রথমবার স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে এসেছেন।


সবিবুর রহমান বলেন, ‘বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত হওয়ায় কক্সবাজারের প্রতি আলাদা আকর্ষণ রয়েছে। বন্ধুদেরও সঙ্গে পেয়েছি—সব মিলিয়ে খুবই ভালো লাগছে।’


একই এলাকার পর্যটক রুমানা রহমান বলেন, ঢাকা থেকে প্রায় নয় ঘণ্টার দীর্ঘ যাত্রার পর তিনি অনেকটাই ক্লান্ত ছিলেন। তবে সাগর দেখার পর সেই ক্লান্তি মুহূর্তেই দূর হয়ে গেছে।


রুমানা বলেন, ‘বিশাল সমুদ্রের ঢেউ আর সৌন্দর্য দেখে মনটা শান্ত হয়ে গেছে। সব মিলিয়ে কক্সবাজার এসে খুবই ভালো লাগছে।’


এদিকে, সাগর শান্ত হলেও সৈকতের কয়েকটি এলাকায় বালুচরে গর্ত তৈরি হয়েছে। জোয়ারের সময় এসব গর্তে পানি জমে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এ কারণে পর্যটকদের সতর্ক করতে মাইকিংয়ের পাশাপাশি তৎপর রয়েছে লাইফগার্ড ও ট্যুরিস্ট পুলিশ।


সী সেফ লাইফগার্ড সংস্থার ইনচার্জ মোহাম্মদ শুক্কুর বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তায় তাঁদের একটি দল সার্বক্ষণিক মাইকিং করছে। কোথায় গোসল করা নিরাপদ, কীভাবে লাইফগার্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করলে বিপদের সময় দ্রুত সহায়তা পাওয়া যাবে-এসব বিষয়ে পর্যটকদের জানানো হচ্ছে।


তিনি বলেন, লাইফগার্ডরাও পর্যটকদের সরাসরি বুঝিয়ে দিচ্ছেন কোন এলাকায় গোসল নিরাপদ এবং কোন এলাকায় ঝুঁকি রয়েছে।


মোহাম্মদ শুক্কুর বলেন, ‘যারা আমাদের নির্দেশনা মেনে চলছেন, তাঁরা নিরাপদে থাকছেন। কিন্তু যারা সতর্কবার্তা উপেক্ষা করছেন, তাঁরাই বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন। তাই পর্যটকদের অনুরোধ করব, সবসময় লাইফগার্ডের নজরদারির আওতায় থাকুন এবং তাঁদের নির্দেশনা মেনে চলুন।’


পর্যটন ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, শীত যত বাড়বে, কক্সবাজারে পর্যটকের ভিড়ও তত বাড়বে। শীতের মৌসুমে পর্যটকের আনাগোনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সৈকত ও পর্যটনকেন্দ্রগুলোও আরও জমজমাট হয়ে উঠবে-এমনটাই আশা তাঁদের।

শীতের আগমনী হাওয়া বদলে দিচ্ছে সমুদ্রসৈকতের চিত্র | সময় নিউজ