মাছুদুর রহমান
প্রকাশ: ২ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৪৬

ফয়সাল করিম মাসুদের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ পেয়েছে সিআইডি
ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ ওসমান হাদিকে ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর প্রকাশ্যে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। পরে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। ঘটনার পর সিসিটিভি ফুটেজ দেখে হাদিকে গুলি করা ব্যক্তি হিসেবে ফয়সাল করিম মাসুদকে শনাক্ত করে পুলিশ।
তদন্তে হাদিকে হত্যার জন্য ফয়সালকে শুটার হিসেবে ভাড়া করা হয়েছিল বলে তথ্য পাওয়ার পর তার আর্থিক লেনদেনের অনুসন্ধান শুরু হয়। ৯ মাসের অনুসন্ধানে ফয়সালের প্রতারণা ও জালিয়াতির নানা তথ্য সামনে আসে।
রাজধানীর নিকেতনের আইটি প্রতিষ্ঠান ইনডিড ক্লাউড বিডি। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে শিল্প মন্ত্রণালয়ের টেন্ডার পাইয়ে দেয়ার কথা বলে প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে পে অর্ডারের মাধ্যমে জামানত হিসেবে ৫৭ লাখ টাকা নেন ফয়সাল। তবে টেন্ডার তো দূরের কথা, এরপর ফয়সালকে আর খুঁজেই পায়নি প্রতিষ্ঠানটি। পরে আদালতে মামলা করেন তারা।
ইনডিড ক্লাউড বিডির পরিচালক (অর্থ ও হিসাব) নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, ‘ছোট প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমাদের জন্য এতগুলো টাকা অনেক বড় বিষয়। বেতন দিতে সমস্যা হয়েছে। অনেক কর্মীকেও আমাদের না করতে হয়েছে। অনেককে ছাটাই করতে হয়েছে। এর রেশ এখনো আমরা কাটিয়ে উঠতে পারিনি।’
শুধু ইনডিড ক্লাউড বিডি নয়, আরও দুটি প্রতিষ্ঠানকে একইভাবে প্রতারণার মাধ্যমে বোকা বানিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেন ফয়সাল। রাজধানীর আদাবরের রিং রোডের গোল্ডেন স্ট্রিটের পিনাকল সলিউশনসের মালিক রাব্বিল ইসলামও ফয়সালের প্রতারণার শিকার হন। নিজের প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ইনটেন্স হোল্ডিংস নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠান থেকে ধার নিয়ে ৩৮ লাখ টাকা ফয়সালের প্রতিষ্ঠানের হিসাবে পে অর্ডারের মাধ্যমে দেন রাব্বিল। ইনডিড ক্লাউড বিডিকেও এই টেন্ডারে যুক্ত করেছিলেন তিনি।
ভুক্তভোগীরা বলেন, ‘উনি চলে গেছেন, এখন তিন-সাড়ে তিন বছর হয়ে যাবে। তার সম্পর্কে কোনো আইডিয়া নেই। এমনিতেই কোনো কিছু যায়নি, কিন্তু তার সম্পর্কে লোকজন এসে খোঁজখবর করছে।’
পিনাকল সলিউশনস ইন্টারন্যাশনালের প্রোপ্রাইটর রাব্বিল হোসেন বলেন, ‘কাজের কথা বলে ওর ডকুমেন্ট ফ্যাব্রিকেটেড করে সচিবালয়ে নিয়ে গেল। সচিবালয়ের লোক দেখাল, সেখান থেকে শিডিউল নিলাম। পুরো বিষয়টিই ছিল সাজানো। সেটা আমরা বুঝতে পারিনি। এখন আর্থিকভাবে একেবারে ক্ষতিগ্রস্ত। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালানোও সম্ভব হচ্ছে না।’
তদন্তে দেখা যায়, এই তিন প্রতিষ্ঠান থেকে পে অর্ডারের মাধ্যমে প্রায় ৯৬ লাখ টাকা নেয় ফয়সাল। টাকা নেয়া হয় এসএমই উইমেন এন্ট্রাপ্রেনার ডাইরেক্টরি প্রজেক্টের নামে খোলা প্রতিষ্ঠানের হিসাবে। পরে সেখান থেকে ৫০ লাখ টাকা পাঠানো হয় তার নিজের প্রতিষ্ঠান অ্যাপল সফট আইটির হিসাবে। সেখান থেকে ৪৫ লাখ টাকা তুলে জমা করা হয় তার স্ত্রীর হিসাবে।
এরপর স্ত্রীর হিসাব থেকে ২৩ লাখ টাকা এবং অ্যাপল সফট আইটির হিসাব থেকে আরও ৪২ লাখ টাকা অনলাইনে নিজের অন্য একটি হিসাবে জমা করেন ফয়সাল। এই ৬৫ লাখ টাকা দিয়ে স্ত্রীর নামে এফডিআর করা হয়। পরে আদালতের নির্দেশে সেই এফডিআর ফ্রিজ করা হয়।
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো. ছুফি উল্লাহ বলেন, ‘প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ, দেশি-বিদেশি মুদ্রা পাচারসহ অপরাধলব্ধ আয় হস্তান্তর, স্থানান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে মানি লন্ডারিং করার অভিযোগের ভিত্তিতে অনুসন্ধান করা হয়। অনুসন্ধানে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় প্রাথমিকভাবে তার নামে একটি মামলা হয়েছে।’
তদন্তে আরও জানা গেছে, ফয়সালের ৫৩টি ব্যাংক হিসাবে ১৪ বছরে ১২৭ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে হাদি হত্যার এক মাস আগে পাঁচটি হিসাবেই লেনদেন হয়েছে ৩ কোটি ৭২ লাখ টাকার বেশি। এই অর্থ হত্যাকাণ্ডে ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে সিআইডি।
একই সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ফয়সালের কোনো সম্পদ রয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করা হচ্ছে। মো. ছুফি উল্লাহ আরও বলেন, ‘মামলায় দুজনের নাম উল্লেখ করে মামলা হয়েছে। আর দুই থেকে তিনজন অজ্ঞাতনামা আসামি রয়েছে।’
এদিকে ফয়সালের ব্যাংক হিসাবের তথ্য পাওয়া গেলেও তার বাসা থেকে উদ্ধার হওয়া ২১৩ কোটি টাকার চেকের রহস্য এখনো উদ্ঘাটন হয়নি। বিষয়টি নিয়েও তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে সিআইডি। এছাড়া অর্থপাচারের অভিযোগে ফয়সালের বিরুদ্ধে আরও দুটি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

